বয়স ১৮ এর নিচে হওয়ায় আইনের দৃষ্টিতে তারা শিশু। কিন্ত অপরাধী হিসেবে যেমন নিষ্ঠুর তেমনি ভয়ংকরও। হত্যা ও ধর্ষণের মতো অপরাধে যুক্ত এই বয়সীরা আসলে কিশোর। গুরুতর অপরাধ করেও আদালতে তারা লঘুদন্ড বা সাজায় ছাড় পায়। কখনও কখনও তাদেরকে কিশোর সংশোধনী কেন্দ্রেও পাঠানো হচ্ছে। দেশের তিনটি সংশোধনী কেন্দ্রে বর্তমানে এমন অপরাধীর সংখ্যা ১ হাজার ৬৪ জন। তাদের মধ্যে ৯৯৬ জন বালক ও ৬৮ জন বালিকা রয়েছে। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন মামলায় সংশ্লিষ্টতা আছে এমন আরও প্রায় শতাধিক কিশোর বিভিন্ন কারাগারে রয়েছে।
গাজীপুরের টঙ্গীতে অবস্থিত দেশের বৃহত্তর কিশোর উন্নয়ন (সংশোধন) কেন্দ্রের সহকারী উপ-তত্বাবধায়ক হাবিবুর রহমান দৈনিক নয়া শতাব্দীকে বলেন, এখানে হত্যা ও ধর্ষনের মত কিশোর অপরাধী রয়েছে। এদের মধ্যে হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ১৪৫ জন এবং ধর্ষন মামলায় অভিযুক্ত ১৭৯জন।
তিনি বলেন, এখানে শিশু হিসেবে তাদের সংশোধন করার চেষ্টা চালানো হয়। অপরাধের ধরণ অনুয়ায়ী তাদের এই মেয়াদ হয়ে থাকে। তবে, উন্নয়ন (সংশোধন) কেন্দ্রে অবস্থানের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে বা কোন কারনে জামিনে বের হলে আবারও তাদের কেউ কেউ নতুন কোন অপরাধ করে।
দেশে সাম্প্রতিক সময়ে ছিনতাই, ধর্ষণ ও হত্যার মতো ঘটনায় কিশোর বয়সীদের সংঘবদ্ধ গ্যাং যুক্ত থাকার অসংখ্য ঘটনা আলোচনায় এসেছে। এ ধরনের অপরাধের ঘটনায় কিশোর বা নাবালক বয়সী অভিযুক্তের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এসব গুরুতর অপরাধে অভিযুক্তরা কিশোর হওয়ায় আদালতে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো কঠোর শাস্তি না পেয়ে পাচ্ছে সীমিত মেয়াদের সাজা বা লঘুদন্ড। ফলে ন্যায়বিচার প্রশ্নে সাধারণ মানুষের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চলতি বছরের মার্চে পটুয়াখালীর দুমকীতে জুলাই আন্দোলনে শহীদ বাবার কবর জিয়ারত করে ফেরার পথে এক কলেজশিক্ষার্থীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের মামলায় তিন কিশোরকে পৃথক আইনে সাজা দেয় আদালত। গত অক্টোবরের ২২ তারিখে আদালতের দেয়া রায়ে দুই কিশোরকে ১৩ বছর করে, অন্যজনকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবদুল্লাহ আল নোমান রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে সাংবাদিকদের জানান, আদালত রায়ে উল্লেখ করেছেন, আসামিরা প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত শিশু সংশোধনাগারে থাকবে। এরপর প্রচলিত আইনে তারা অন্য আসামিদের মতো কারাগারে সাজা ভোগ করবে।
আদালতের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তরা ঘটনার সময় নাবালক হওয়ায় ’চিলড্রেন অ্যাক্ট ২০১৩’ -এর বিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ সীমিত সাজা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সেসময় আদালত প্রাঙ্গনে ভুক্তভোগীর পরিবার বলছে, “অপরাধ বড়, কিন্তু শাস্তি ছোট; এতে ভবিষ্যতে কিশোর অপরাধ বাড়তে পারে।”
এছাড়া, গত ফেব্রুয়ারীতে নাটোর জেলার শিশু আদালত মাদক সেবনের তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দেওয়ায় রবিউল ইসলাম (১৫) নামের এক কিশোরকে হত্যার দায়ে আরেক কিশোরকে ১০ বছরের আটকাদেশ দেয়। জানুয়ারীতে নিজের মা’কে হত্যার দায়ে এক কিশোরীকে ১০ বছরের আটকাদেশ দিয়ে বলা হয় মামলা দায়েরের সময় ওই কিশোরীর বয়স ছিল ১৬ বছর ২ মাস। রায়ে বলা হয়, অভিযুক্ত ঘটনার সময় কিশোর ছিল। তাই শিশু আদালত থেকে তাকে ১০ বছরের ‘ডিটেনশন অর্ডার’ প্রদান করা হয়েছে।
স্থানীয় আইনজীবীরা সেসময় অভিযোগ করে বলেন, ‘এ ধরনের রায় আদালতের আইনি বাধ্যবাধকতা হলেও, সমাজে “ন্যায়বিচারের অসম ভারসাম্য” তৈরি করছে।
বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায়ও বেশ কয়েকজন অভিযুক্ত কিশোর হিসেবে চিহ্নিত হন। তাদের বিরুদ্ধে আলাদা শিশু আদালতে বিচার প্রক্রিয়া চলে। প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সাজা হলেও কিশোর আসামিদের সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সাজা দেওয়া হয়।
আইনে বলা হয়েছে, কিশোর অপরাধে মৃত্যুদণ্ড নয়। ১৮ বছরের নিচে কেউ অপরাধ করলে তাকে ‘শিশু’ হিসেবে গণ্য করা হয়। আইন অনুযায়ী, কোনো শিশুকে মৃত্যুদণ্ড বা আজীবন কারাদণ্ড দেওয়া যায় না। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেও শিশুকে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত উন্নয়ন (সংশোধন) কেন্দ্রে পাঠানো যেতে পারে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ, বর্তমানে ছুটিতে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান দৈনিক নয়া শতাব্দীকে বলেন, এই আইনটি যখন হয়েছিল তখন কিশোরের অপরাধগুলো এরকম ছিলনা। এখন আমাদের উচিত অপরাধ ধরন বিভক্ত করে তার পর সাজা নির্ধারন করা। সারাবিশ্বে আসলে কিশোর আইন একই, তবে আমাদের এখন হত্যা-ধর্ষনের মত অন্যায় অপরাধ যারা করে তাদের এডাল্টদের মতই সাজা দেওয়া উচিত।
হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলছেন, এই মুহূর্তে কিশোর গ্যাং রাষ্ট্রের এক বিশাল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যান্য দেশের মত সংশোধনাগার বলতে যা বুঝায় আমাদের দেশে তো আর আদতে তা নয়। দেশের সর্বজন মিলিত হয়ে, যেখানে রাজনৈতিক ব্যক্তি থেকে শুরু করে সুধীজন বা সরকার দলীয় লোকজন থাকবে -তাদের নিয়ে এই পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে ভাববার ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় হয়েছে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল তথা সন্ত্রাসী বাহিনী অস্ত্র বহন সহ মারাত্নক কাজগুলো কিশোর বয়সীদের দিয়ে করায়। কারন তারা জানে শিশুদের সাজা কম। এছাড়া তারা শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে বের হবার পর তাদেরকে অপরাধী গ্রুপে যুক্ত করা সহজ। তাই এসব রোধে কঠোর আইন প্রণয়নের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকি পাড়া-মহল্লা থেকেই নৈতিকতার শিক্ষা, শিষ্টাচার ও মানবিক মুল্যবোধ শেখানোর ব্যবস্থাও করতে হবে।
কিশোর সংশোধনী কেন্দ্রের চিত্র
দেশে তিনটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে শিশু-কিশোরদের সংশোধনের বদলে কি দেওয়া হয় তা জানতে অনুসন্ধান করে জানা যায়, এই কেন্দ্রগুলোতে নিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নজিরবিহীন অব্যবস্থাপনা সৃষ্টি করে রেখেছে। এখানে বন্দীদের ঠিকমতো খাবার দেয়া হয় না। নিয়মিত মেডিকেল চেকআপ করানো হয়না। বন্দীদের স্বাভাবিক ও উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখানোর পরিবর্তে চালানো হয় জুলুম-নির্যাতন। ইতোপূর্বে যশোর ও টঙ্গী থেকে বন্দী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে পালিয়ে যাবার ঘটনাও ঘটেছে।
শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে হত্যার অভিযোগও আছে। কয়েক বছর আগে ‘বেয়াড়া’ শিশুদের উচিত শিক্ষা দেওয়ার নাম করে যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের কর্মীরা ১৮ শিশুর ওপর নির্মম নির্যাতন চালান। এতে তিন কিশোর মারা যায় ও আহত ১৫ কিশোরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় কেন্দ্রের পাঁচ কর্মকর্তা ও সাত বন্দী কিশোরের বিরুদ্ধে মামলাও হয়। ২০২৪ সালে টঙ্গীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে এক বন্দী কিশোর জ্বর নিয়ে তিনদিন ভূগে মারা যায়। অভিযোগ রয়েছে, কর্তৃপক্ষ যথাসময়ে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা না করায় ওই বন্দী কিশোরের মৃত্যু হয়েছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, দেশে-বিদেশে কিশোর অপরাধ নতুন নয়। যুগ যুগ ধরে ডানপিটে ছেলে, মাস্তান, যারা এলাকায় হৈ-হুল্লোড়, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা থেকে শুরু করে মারামারির মতো ঘটনা ঘটাতো তারাই কিশোর অপরাধী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের গতি, প্রকৃতি ও স্বভাবে এসেছে আরও নেতিবাচক পরিবর্তন। বিগত কয়েক দশকে দেশে কিশোর অপরাধের পরিসংখ্যানই বলছে কিশোররা কীভাবে প্রচলিত আইন ও সামাজিক অনুশাসনের জাল ছিন্ন করে সাধারণ অপরাধ থেকে খুন, ধর্ষণসহ জঘন্য অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। এর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের অপরাধের মাত্রা বয়স্ক অপরাধীদের নিষ্ঠুরতাকেও হার মানাচ্ছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বিভিন্ন সময় তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে, আদালতের মাধ্যমে তাদের সংশোধনের আওতায় নেওয়া হচ্ছে কিন্তু তাতে করে তাদের সংখ্যা ও অপরাধ কমছে না।
এদিকে, দেশে অসংখ্য অভিভাবক তাদের বেয়াড়া কিশোর বয়সী সন্তানদের নিয়ে বিপাকে রয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার প্রতিফলনও ঘটে। সম্প্রতি এক মা টঙ্গীর কিশোর সংশোধনী কেন্দ্রের ফেসবুক পেইজে লিখেছেন, ‘ভাই দয়া করে একটা ফোন বা মোবাইল নম্বর দেয়া যাবে? আমার ছেলেকে নিয়ে চরম ঝামেলায় আছি। আমি খুব ডিপ্রেসনে আছি ছেলেকে নিয়ে। ‘
নয়াশতাব্দী/এনএ