২২ ফাল্গুন, ১৪৩২

০৬ মার্চ, ২০২৬

জুলাই সনদ ও গণভোট, ঐকমত্যের ভাঙন, রাজনীতির নতুন সন্ধিক্ষণ

মো. শামীম মিয়া প্রকাশিত: নভেম্বর ১১, ২০২৫, ১:১৮ অপরাহ্ন
জুলাই সনদ ও গণভোট, ঐকমত্যের ভাঙন, রাজনীতির নতুন সন্ধিক্ষণ

বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ নির্ধারণ করবে। গণভোট ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অচলাবস্থা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক গভীর দুর্বলতাকে উন্মোচন করেছে। সাত দিনের সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে , অথচ রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। অন্তর্বর্তী সরকার এখন বলছে যদি দলগুলো ব্যর্থ হয়, তারা নিজেরা সিদ্ধান্ত নেবে। এই ঘোষণা শুধু প্রশাসনিক নয়, এটি এক ঐতিহাসিক মোড়, যেখানে গণতান্ত্রিক সমঝোতার জায়গায় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। 

জুলাই সনদ ২০২৫ মূলত বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামো ও শাসনব্যবস্থাকে নতুনভাবে গঠনের প্রস্তাব। সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি, দলীয় জবাবদিহি ও নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি-সব মিলিয়ে এটি এক যুগান্তকারী রূপরেখা। কিন্তু এই রূপরেখা বাস্তবায়নের আগে জনগণের অনুমোদন চাওয়াই গণভোটের উদ্দেশ্য। 

সরকারের যুক্তি-জনগণের অনুমোদন ছাড়া নতুন কাঠামো গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র মতভেদ। বিএনপি চায় জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হোক, জামায়াত চায় গণভোট আগে হোক। সরকারের অবস্থান বিএনপির কাছাকাছি, কারণ একদিনে নির্বাচন করলে প্রশাসনিক চাপ ও ব্যয় কমবে। কিন্তু এই মতপার্থক্যের গভীরে আছে আস্থার সংকট। দলগুলো একে অপরকে সন্দেহ করছে। জামায়াত মনে করছে, সরকার ও বিএনপি পর্দার আড়ালে সমঝোতায় পৌঁছেছে, আর বিএনপি বলছে, সরকার পুরো প্রক্রিয়াকে নিজেদের সুবিধামতো সাজাতে চাইছে। এই অবিশ্বাসের দেয়ালই আজ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় অন্তরায়। 

সাত মাসের আলোচনার পরও কমিশন কোনো অভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। সরকার এখন বলছে, রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতার দায় তারা নেবে না। বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক অভিযোগ করেছেন, ‘সরকার জানত যে সব দল একমত হবে না, তবু মাত্র সাত দিনের সময় দিয়ে দায় অন্যের ঘাড়ে চাপাচ্ছে।’ সরকারের ঘনিষ্ঠ মহল অবশ্য বলছে, এই সময়সীমা প্রতীকী; তারা চাইছে রাজনৈতিক দলগুলো শেষ মুহূর্তে হলেও ন্যূনতম ঐকমত্যে আসুক।

কিন্তু সময় এখন সরকারের হাতে। ১৩ নভেম্বর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ১৫ নভেম্বরের মধ্যে জারি হতে পারে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোট অধ্যাদেশ। এভাবেই শুরু হতে যাচ্ছে এক নতুন সাংবিধানিক অধ্যায়, যেখানে জনগণ প্রথমবারের মতো সরাসরি ভোটের মাধ্যমে সংবিধানের দিক নির্ধারণ করবে। আইনি দিক থেকে এই গণভোট বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। বর্তমান সংবিধানে গণভোটের বিধান স্পষ্ট নয়। ১৯৯১ সালের গণভোট আইন কিছু বিষয়েই প্রযোজ্য, কিন্তু সংবিধান সংস্কার সনদের মতো বিস্তৃত বিষয়ে নয়। তাই সরকারকে বিশেষ অধ্যাদেশ আনতে হচ্ছে। 

এই অধ্যাদেশে নির্ধারিত হবে কে ভোট দিতে পারবে, কীভাবে ফলাফল অনুমোদিত হবে, এবং জনগণের রায় কার্যকর করার পদ্ধতি কী হবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গণভোটের প্রশ্ন দুটি হতে পারে-এক, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অনুমোদন; দুই, সংবিধানের ৪৮টি সংশোধনী প্রস্তাবের অনুমোদন। অর্থনৈতিক দিক থেকেও একই দিনে ভোট নেওয়া সরকারের জন্য সুবিধাজনক। আলাদা দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন করলে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে। একই কর্মকর্তাদের বারবার নিয়োগ দিতে হবে, নিরাপত্তা ও লজিস্টিক খরচ দ্বিগুণ হবে। সবচেয়ে বড় সমস্যা ভোটার উপস্থিতি। আলাদা গণভোটে দলীয় প্রার্থী না থাকলে জনগণের আগ্রহ কমে যায়। তবে বিএনপি ও জামায়াতের মতো বড় দলগুলো এখনো দ্বিধায়। বিএনপি আশঙ্কা করছে, সরকার প্রশাসনিকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। জামায়াতের উদ্বেগ গণভোট আগে না হলে জনগণ সনদ সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত হবে না। দলটি বলেছে, ‘গণভোট আগে হোক, নইলে আমরা রাজপথে আন্দোলনে যাব।’  এই ঘোষণা সরকারের জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে। সরকারও বুঝছে, একতরফা সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে। জুলাই সনদের সবচেয়ে আলোচিত অংশ সংসদের উচ্চকক্ষ। সরকারের প্রস্তাব অনুযায়ী এটি হবে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে। যে দল যত ভোট পাবে, তত আসন। এই পদ্ধতিতে ছোট দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে, যা বহুমাত্রিক গণতন্ত্রের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু বিএনপি চায় নিম্নকক্ষের আসন সংখ্যার অনুপাতে বণ্টন। তাদের যুক্তি, ভোটভিত্তিক বণ্টনে ছোট দলগুলো অযথা প্রভাবশালী হয়ে উঠবে। সরকারের উপদেষ্টারা আশা করছেন, বিএনপি যদি এই পদ্ধতিতে আপত্তি না করে, তবে জামায়াতও গণভোটের সময়সূচিতে ছাড় দেবে। এই মুহূর্তে সরকার “সমঝোতামূলক মডেল” বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে যেখানে কোনো দল পুরোপুরি খুশি না হলেও সবাই আংশিকভাবে গ্রহণ করবে। কিন্তু সময় যত ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য তত আক্রমণাত্মক হচ্ছে। বিএনপি বলছে, ‘একতরফা সিদ্ধান্ত হলে আমরা আন্দোলনে যাব।” জামায়াত একই সুরে বলছে, “গণভোট আগে না হলে রাজপথে প্রতিরোধ গড়ে তুলব।’ 

এদিকে সুশীল সমাজের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। সাধারণ মানুষও বুঝতে পারছে না, গণভোটের প্রশ্ন আসলে কী। সাধারণ মানুষ বলছেন , ‘আমরা শুনছি বড় বড় কথা-জুলাই সনদ, গণভোট।কিন্তু কেউ তো বলে না এর মানে কী, আমাদের জীবনে এর প্রভাব কী হবে।’ এই অজ্ঞতা গণতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ, কারণ গণভোটের ভিত্তিই হলো জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ।অন্তর্বর্তী সরকার এখন একদিকে প্রশাসনিক বাস্তবতা, অন্যদিকে রাজনৈতিক চাপ-দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করতে চাচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থাভাজন হলেও, দেশের ভেতরে রাজনৈতিক বৈধতার প্রশ্ন এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মহল বাংলাদেশের গণভোটকে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার প্রমাণ হিসেবে দেখছে। কিন্তু যদি ফলাফল বিতর্কিত হয়, তাহলে এই প্রক্রিয়া উল্টো অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে।

ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরিকল্পনা থাকায় হাতে সময় অতি সীমিত। এর মধ্যেই গণভোটের আয়োজন করা প্রশাসনিকভাবে দুঃসাধ্য। তবু সরকার দৃঢ় অবস্থানে। তারা চায় এই সময়ের মধ্যেই সংবিধান সংস্কারের জনসমর্থন নিশ্চিত করতে। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়-এই প্রক্রিয়াটি কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক? রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়া গণভোট হলে সেটি কি সত্যিই জনগণের মতামত প্রতিফলিত করবে? নাকি এটি কেবল সরকারের একতরফা উদ্যোগ হিসেবে থেকে যাবে? ইতিহাস বলছে, জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে কোনো রাষ্ট্র কাঠামো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আজ বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সামনে দুটি পথ। একটি হলো ঐকমত্যের পথে, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে; আরেকটি হলো একতরফা সিদ্ধান্তের পথে, যেখানে সরকার রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে সমাধান চাপিয়ে দেবে। 

প্রথম পথ কঠিন, কিন্তু টেকসই; দ্বিতীয় পথ সহজ, কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ। জুলাই সনদ ও গণভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশ আসলে নিজেকেই প্রশ্ন করছে-আমরা কি সত্যিকারের গণতন্ত্র চাই, নাকি কেবল ক্ষমতার নতুন বিন্যাস? অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চাহিদা আস্থা ও সংলাপের। রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিজেদের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চিন্তা করতে পারে, তবে এই গণভোট হয়ে উঠতে পারে গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের সূচনা। আর যদি ব্যর্থ হয়, তবে এটি হবে নতুন সংঘাতের প্রস্তাবনা যেখানে আবারও হারবে জনগণ, হারবে বিশ্বাস, আর হারাবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক স্বপ্ন।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

(দৈনিক নয়া শতাব্দীর সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, দৈনিক নয়া শতাব্দী কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার দৈনিক নয়া শতাব্দী নেবে না।)