বাংলাদেশের রাজনীতি আজ যেন এক অন্তহীন নাট্যমঞ্চ যেখানে গণতন্ত্রের আদর্শ, জনগণের আশা, নৈতিকতার আলো সবই ম্লান হয়ে গেছে দলীয় স্বার্থ, ক্ষমতার লোভ এবং ‘মনোনয়ন নামের এক অদ্ভূত খেলায়’। রাজনীতির এই মঞ্চে প্রতিদিনই নতুন চরিত্র আসে, পুরনো চরিত্র সরে যায়; কিন্তু গল্প একই। দলীয় টিকিট কে পেল, কে পেল না, আর কে টিকিট না পেয়ে রাস্তায় নেমে পড়ল। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণার পর যে চিত্রটি আমরা দেশের বিভিন্ন জেলায় দেখেছি, তা কেবল রাজনৈতিক অস্থিরতার চিত্র নয়, বরং এটি আমাদের গণতন্ত্রের গভীর অসুস্থতার প্রতিচ্ছবি। একসময় রাজনীতি ছিল মানুষের কল্যাণের লড়াই, সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার সংগ্রাম। কিন্তু এখন রাজনীতি যেন কেবল টিকিটের খেলা, যেখানে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া মানে জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। আর না পাওয়া মানে এক ধাক্কায় তার রাজনীতির মৃত্যুঘণ্টা।
বিএনপি যখন ২৩৭টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করল, তখন দেখা গেল এক ভয়াবহ বাস্তবতা। যেখানে কেউ আনন্দে মিষ্টি বিলাচ্ছেন, আর কেউ টায়ার জ্বালিয়ে মহাসড়ক অবরোধ করছেন। মেহেরপুর, কুমিল্লা, ফরিদগঞ্জ, শিবচর, সাতক্ষীরা, নাটোর, চট্টগ্রাম-সবখানেই একই নাটক: কেউ পছন্দের প্রার্থী না পেয়ে বিক্ষোভ করছে, কেউ আগুন দিচ্ছে, কেউ সড়ক বন্ধ করছে, কেউ আবার ‘হুমকি’ দিচ্ছে মনোনয়ন না বদলালে কঠোর আন্দোলনে নামবে। একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাস্তায় আগুন জ্বালানো, সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ করা, স্কুলগামী শিশু থেকে শুরু করে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে ভোগান্তি সৃষ্টি করা এটি কেবল দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ নয়, বরং গণতন্ত্রের প্রতি চরম অবমাননা। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে যদি একজন নেতা জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে জিম্মি করে রাখেন, তবে তিনি কেমন জনপ্রতিনিধি হতে চান? জনগণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে জনগণের প্রতিনিধি হওয়ার নৈতিকতা কোথায়?
এই প্রশ্নগুলো আজ অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। রাজনীতির এই নোংরা খেলায় সবচেয়ে বড় পরাজিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। তারা ভোট দেয় উন্নয়নের প্রত্যাশায়, নিরাপত্তার আশায়, আর ন্যায়বিচারের আকাঙ্খায়, কিন্তু যখন সেই রাজনীতিই তাদের জীবনকে অচল করে তোলে, তখন গণতন্ত্রের অর্থই হারিয়ে যায়। মনোনয়নবঞ্চিত প্রার্থীর সমর্থকরা যখন সড়ক অবরোধ করে, আগুন জ্বালায়, যানবাহন থামিয়ে জনগণকে জিম্মি করে রাখে তখন তারা আসলে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে না শুধু, বরং রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলাকেও অস্থির করছে। গণতন্ত্রে প্রতিবাদের অধিকার আছে, কিন্তু সেই অধিকার কখনোই অন্যের স্বাধীনতা,জীবনযাত্রা বা নিরাপত্তা লঙ্ঘন করতে পারে না।
এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে, আমাদের দলীয় রাজনীতি এখন ‘গণতান্ত্রিক’ নয়, বরং আমলাতান্ত্রিক ও পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর। মনোনয়ন বণ্টনে যোগ্যতা নয়, বরং তোষামোদ, অর্থবল, আত্মীয়তা ও প্রভাবই মুখ্য হয়ে উঠেছে। যিনি তৃণমূলের সঙ্গে বছরের পর বছর সম্পর্ক গড়েছেন, যিনি রাজপথে নির্যাতিত হয়েছেন, তিনিও বাদ পড়ছেন শুধু এই কারণে যে তিনি দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রিয় তালিকায় নেই। অন্যদিকে, যিনি অর্থ, প্রতিশ্রতি বা প্রভাবের জোরে এগিয়ে আসেন, তিনিই পাচ্ছেন মনোনয়ন। এর ফলে রাজনীতিতে এক প্রকার পেশাদার ‘মনোনয়ন ব্যবসা’ তৈরি হয়েছে, যা দলের ভেতর নৈতিকতার মৃত্যু ঘটাচ্ছে। মনোনয়নকে ঘিরে এই বিশৃক্সখলা আসলে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক দুর্বলতার ফল।
দলের ভেতরে গণতন্ত্র নেই, সিদ্ধান্তের ক্ষমতা গুটিকয়েক ব্যক্তির হাতে। তৃণমূলের মতামত কেবল কাগজে থাকে, বাস্তবে কোনো প্রভাব ফেলে না। এ কারণে যখন সিদ্ধান্ত আসে, তখন যারা বাদ পড়ে তারা নিজেদের ‘অবিচারের শিকার’ মনে করে। তাদের ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয় সহিংসতায়। এটি শুধু বিএনপির সমস্যা নয়। বাংলাদেশের প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দলেই একই চিত্র। দল মানেই ‘নেতার ব্যক্তিগত মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান’, যেখানে মতভেদ মানেই বিশ্বাসঘাতকতা, আর প্রতিবাদ মানেই বিদ্রোহ। রাজনীতির এই সংস্কৃতি কেবল নৈতিকতাকে হত্যা করছে না, বরং নতুন প্রজন্মের কাছে এক বিকৃত বার্তা দিচ্ছে। তরুণরা দেখছে, রাজনীতি মানে এখন আদর্শ নয়, বরং পদ-পদবির জন্য লড়াই। তারা দেখছে, জনপ্রতিনিধি হতে হলে জনগণের পাশে নয়, দলের ক্ষমতাবান নেতার পাশে থাকতে হয়। এর ফলে তরুণদের এক অংশ রাজনীতি থেকে বিমুখ হচ্ছে, আরেক অংশ তা গ্রহণ করছে কৌশল ও সুবিধার খেলায়। এভাবে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি জনসম্পৃক্ততা ক্রমে ক্ষয় হচ্ছে।
এখানে দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব সবচেয়ে বড়। তারা যদি প্রার্থী বাছাইয়ে ন্যায়, স্বচ্ছতা ও যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার না দেয়, তবে তাদের দলীয় ঐক্য কখনোই টিকবে না। জনগণের কাছে দায়বদ্ধ না থেকে যদি দল কেবল ক্ষমতার লোভে বিভক্ত হয়, তবে সেই দলের পতন অবধারিত। নেতৃত্বকে বুঝতে হবেÑমনোনয়ন কোনো পুরস্কার নয়, বরং জনগণের প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব। যারা সেই দায়িত্বের মর্যাদা দিতে পারে না, তাদের হাতে দল বা দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপদ নয়। বিএনপির সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো একদিকে দলীয় শৃঙ্খলার সংকট, অন্যদিকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভয়াবহ অবনতি। একজন মনোনয়নবঞ্চিত প্রার্থীর ক্ষোভকে যদি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, তাহলে সেটি কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, বরং রাজনৈতিক নৈতিকতার দেউলিয়াত্ব। কারণ, সত্যিকারের রাজনীতিক জনগণের প্রতি করে কখনো নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে না। তিনি জানেন, জনগণই তাঁর শক্তি, আর তাদের দুর্ভোগ মানেই তাঁর দুর্বলতা।
এখন প্রশ্ন কীভাবে এই নোংরা রাজনীতি থেকে মুক্তি সম্ভব? প্রথমত, দলীয় মনোনয়ন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ করতে হবে। প্রতিটি দলের উচিত তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে প্রার্থী নির্বাচন করা, যাতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে না পারে। দ্বিতীয়ত, মনোনয়নপ্রাপ্ত ও বঞ্চিত উভয়ের জন্যই দলের অভ্যন্তরীণ আপিল বা আলোচনার সুযোগ থাকতে হবে। তৃতীয়ত, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে জনগণের ক্ষতি করা যে অপরাধ, তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। আর সর্বোপরি, রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে নৈতিকতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা ফিরিয়ে আনতে হবে। জনগণের দিক থেকেও সচেতনতা জরুরি। যেসব রাজনীতিক জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে দলীয় অসন্তোষ প্রকাশ করেন, তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। জনগণকে বুঝতে হবে, রাজনীতি মানে সেবা, ত্যাগ ও সততা।
জনগণ যদি এই বার্তা দেয় যে সহিংস রাজনীতিকরা তাদের সমর্থন হারাবে, তবে রাজনৈতিক দলগুলোও বাধ্য হবে আচরণ পরিবর্তনে। আমরা যদি গণতন্ত্রকে সত্যিই বাঁচাতে চাই, তবে দলীয় মনোনয়নের সংস্কৃতি বদলাতে হবে। মনোনয়ন যেন না হয় ব্যক্তিগত অনুগ্রহের ফল, বরং জনগণের আস্থার প্রতিফলন। রাজনীতিকদের বুঝতে হবে মনোনয়ন কোনো যুদ্ধের ট্রফি নয়, এটি এক ধরনের দায়িত্ব, যা জনগণের বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সেই বিশ্বাস ভঙ্গ করলে শুধু দল নয়, পুরো রাষ্ট্র হারায়। আজ সময় এসেছে দলীয় নেতৃত্বকে নিজস্ব আয়নায় নিজেকে দেখার। প্রশ্ন করার আমরা কিসত্যিই জনগণের জন্য রাজনীতি করছি, নাকি কেবল নিজেদের জন্য?
দলীয় কার্যালয়ের টেবিলে বসে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করলেই কি গণতন্ত্র পূর্ণতা পায়? না, গণতন্ত্র তখনই পূর্ণতা পায়, যখন জনগণের মতামত দলীয় নীতির মূলভিত্তি হয়।রাজনীতির ইতিহাস বলে যে দেশে দল জনগণের উপরে, সেই দেশে গণতন্ত্র বেঁচে থাকে না। আর যে দেশে জনগণ দলের উপরে,সেই দেশেই রাজনীতি পায় সফলতা। বাংলাদেশের রাজনীতিকে আজ সেই পথেই ফিরতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে, ক্ষমতা মানে নয় আধিপত্য, বরং জনগণের সেবা। দলীয় মনোনয়ন মানে নয় টিকিটের খেলা, বরং জনগণের আস্থা অর্জনের সুযোগ। মনোনয়ন-পরবর্তী আগুন, অবরোধ বা সংঘর্ষ গণতন্ত্রের লজ্জা। এগুলো ক্ষমতার রাজনীতি নয়, বরং রাজনৈতিক অরাজকতার প্রতীক। যে প্রার্থী সত্যিই জনগণের প্রতিনিধি হতে চান, তিনি জনগণকে বিপদে ফেলেন না; বরং তাঁদের পাশে দাঁড়ান। তিনি মনোনয়ন বঞ্চনা মানে দলের ব্যর্থতা নয়, বরং আত্মবিশ্লেষণের সুযোগ মনে করেন। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি যদি এইভাবে অবক্ষয়ের দিকে যায়, তবে সেই উন্নয়নও টেকসই হবে না। একটি দেশকে টিকিয়ে রাখে রাজনীতির নৈতিকতা, নেতৃত্বের সততা ও জনগণের আস্থা। যদি এই তিনটি হারিয়ে যায়, তবে উন্নয়নের দালান দাঁড়াবে বালুর ওপর।
তাই এখনই সময় ‘রাজনীতির নোংরা নাটক’ বন্ধ করার। দলীয় মনোনয়নের নামে যে অশান্তির আগুন জ্বলে উঠছে, তা নেভাতে হবে দায়িত্বশীল নেতৃত্বের মস্তিষ্ক দিয়ে, প্রতিশোধের আগুন দিয়ে নয়। জনগণকে কষ্ট দিয়ে কোনো দল দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না-এ সত্য ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে।
গণতন্ত্রের সত্যিকারের শক্তি দলীয় টিকিটে নয়, জনগণের আস্থায়। সেই আস্থা ফিরে পেতে হলে রাজনীতিকে আবার নীতি, মূল্যবোধ ও দায়িত্বের পথে ফিরতে হবে। দলীয় মনোনয়ন হবে স্বচ্ছ, প্রার্থীরা হবে ত্যাগী ও যোগ্য, আর জনগণ হবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুÑতবেই রাজনীতি ফিরে পাবে তার হারানো মর্যাদা।
আজ যারা সড়কে টায়ার জ্বালাচ্ছেন, আগামীকাল তারা হয়তো নিজেরাই বুঝবেনএই আগুন কেবল তাদের প্রতিবাদের নয়, এটি পুরো জাতির বিবেকের ওপর দাগ ফেলছে। যদি আমরা এখনই এই নোংরা খেলাকে থামাতে না পারি, তবে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। রাজনীতির মানে তখন আর নীতি নয়, কেবল ক্ষমতা হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সেই দিনটির ওপর, যেদিন রাজনীতিকরা বুঝবেন মনোনয়ন পাওয়া নয়, জনগণের বিশ্বাস অর্জন করাই প্রকৃত বিজয়। এবং সেই দিনই রাজনীতি আবার হবে মহৎ, গণতন্ত্র আবার হবে জনগণের।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
(দৈনিক নয়া শতাব্দীর সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, দৈনিক নয়া শতাব্দী কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার দৈনিক নয়া শতাব্দী নেবে না।)