২২ ফাল্গুন, ১৪৩২

০৬ মার্চ, ২০২৬

শব্দের জাদুকর রিপন নাথ

হাওয়া সিনেমায় সাউন্ড করেছি দেড় বছর ধরে

নিশক তারেক আজিজ প্রকাশিত: নভেম্বর ৯, ২০২৫, ১০:৩২ পূর্বাহ্ন
হাওয়া সিনেমায় সাউন্ড করেছি দেড় বছর ধরে
ছবি: আরিফ আহমেদ

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে শব্দের এক নির্ভরযোগ্য নাম — রিপন নাথ। পর্দার পেছনের এই শিল্পী নীরবেই সাজিয়ে তুলেছেন অসংখ্য চলচ্চিত্রের আবেগ, উত্তেজনা ও বাস্তবতার সুর। তিনি পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জয়ী শব্দগ্রাহক ও পরিকল্পক। ‘ব্যাচেলর’ থেকে শুরু করে ‘মনপুরা’, ‘আয়নাবাজি’, ‘হাওয়া’ বা ‘সুড়ঙ্গ’-এর মতো জনপ্রিয় ছবিগুলোর নিখুঁত শব্দজগৎ নির্মাণ করেছেন এই শিল্পী। শব্দই তাঁর জীবন, পেশা ও নেশা। সম্প্রতি ‘সাউন্ডবক্স স্টুডিও’-তে বসে নিশক তারেক আজিজ—  কথা বলেছেন এই গুণী কারিগরের সঙ্গে।

সাউন্ডের প্রতি আগ্রহের শুরুটা কীভাবে?
আমার বেড়ে ওঠা রাজবাড়ী, চট্টগ্রাম আর ঢাকায়। বাবা ছিলেন রেলের কর্মকর্তা, মা গৃহিণী। ছোটবেলা থেকেই প্রচুর মিউজিক  শুনতাম, আর যেহেতু ক্ল্যাসিক্যাল শিখতাম, সেই থেকেই মিউজিকের ডিজাইন এবং মিক্সিং এর প্রতি কৌতূহল ছিল। তখনই শব্দের প্রতি এক অদ্ভুত টান জন্মায়।

প্রথম পেশাগত কাজের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
প্রথম কাজটা ছিল বিজ্ঞাপনী সংস্থা এশিয়াটিকের ধ্বনিচিত্রে। নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরীর একটি প্রামাণ্যচিত্রে লোকেশন সাউন্ড রেকর্ডিং করি। এরপর ২০০৪ সালে বড়পর্দায় প্রথম কাজ ‘ব্যাচেলর’ –এর শব্দ সম্পাদনা। তখন বুঝিনি, এই পথটাই জীবনের পেশা হয়ে যাবে।

আপনি তো প্রায় সব বড় নির্মাতার সঙ্গেই কাজ করেছেন। কোন অভিজ্ঞতা সবচেয়ে স্মরণীয়?
প্রত্যেকটা প্রজেক্ট আলাদা একটা পৃথিবী। ‘মনপুরা’-র কাজ আমার জন্য টার্নিং পয়েন্ট ছিল— তখনই অনেকেই আমার কাজ লক্ষ্য করতে শুরু করেন। ‘আয়নাবাজি’, ‘ডুব’, ‘ন ডরাই’, ‘ফাগুন হাওয়ায়’, ‘হাওয়া’— প্রত্যেকটার শব্দ ডিজাইন ভিন্ন চ্যালেঞ্জ ছিল।

‘নো ল্যান্ডস ম্যান’-এ কাজ করাও ছিল গর্বের অভিজ্ঞতা। সেখানে এ. আর. রহমান স্যার ছিলেন সঙ্গীতে— এমন এক দলে কাজ করা সত্যিই প্রেরণাদায়ক।

একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন— পুরস্কার আপনার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
পুরস্কার অবশ্যই অনুপ্রেরণা দেয়। পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছি, এটা আমার জন্য সম্মানের। তবে সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো দর্শকের প্রতিক্রিয়া— যখন কেউ বলে, “গান না থাকলেও ছবিটা শুনতে ভালো লাগলো!” তখনই মনে হয়, পরিশ্রম সফল হয়েছে।

শব্দ নিয়ে কাজ করা— অনেকেই বুঝতে পারেন না এর জটিলতা। একটু বলুন, কীভাবে কাজটা করেন?
শব্দ আসলে গল্প বলার এক নিঃশব্দ মাধ্যম। ভালো সাউন্ড ডিজাইন মানে শুধু সংলাপ পরিষ্কার রাখা নয়— পুরো পরিবেশ, বাতাস, নীরবতা, প্রতিধ্বনি— সব মিলিয়ে একটা মুড তৈরি করা। একটা বৃষ্টি পড়ার শব্দও গল্পের আবেগ বদলে দিতে পারে। যখন পর্দায় নীরবতা আসে, তখনই দর্শক সবচেয়ে মনোযোগী হয়। আর আমার কাজ, সেই নীরবতাকে অর্থপূর্ণ করে তোলা।

সাউন্ডবক্স স্টুডিও প্রতিষ্ঠার ভাবনা কীভাবে এলো?
দীর্ঘদিন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর মনে হলো— একটা নিজস্ব জায়গা দরকার, যেখানে স্বাধীনভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যাবে। তাই তৈরি করি ‘সাউন্ডবক্স স্টুডিও’। এখন এখানে চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপন, ওয়েব সিরিজ— সব ক্ষেত্রেই কাজ করি।

আন্তর্জাতিক উৎসবেও তো আপনার কাজ প্রদর্শিত হচ্ছে…
হ্যাঁ, সৌভাগ্যবশত আমার কাজ করা বেশকিছু  ছবি কান, রটারডাম, লোকার্নো, বুসান, সাংহাইসহ বড় বড় উৎসবে দেখানো হয়েছে। বিদেশে গিয়ে যখন দেখি, বাংলা ছবির শব্দে তারা মুগ্ধ— তখন গর্ব হয়।

সাউন্ড নিয়ে কাজ করাতো অনেক ধৈর্য্যের কাজ। একটা ফিল্মে কত ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেছেন?
একটা ফিল্মের শব্দের কাজ ভালো করতে হলে অনেক সময় লাগে। হাওয়া সিনেমার সাউন্ড করছি দেড় বছর ধরে । সরোয়ার ভাইয়ের ছবিগুলাতে অনেক টাইম যায়, কারন তিনি খুব পারফেক্ট কাজ আয় আয়নাবাজি করছি প্রায় ৭/৮ মাস ধরে । হাওয়া সিনেমায় মিনিমাম ১০০ শিফট কাজ করেছি । ঘণ্টা হিসেব করলে প্রায় ১৬০০ ঘন্টার মত কাজ করেছি । একটা সিনেমা খুব ভালো করতে চাইলে কমপক্ষে ৪০০ থেকে ঘণ্টা লাগবে । 

প্রফেশন হিসেবে এই সেক্টর টা কেমন? নতুন প্রজন্ম যদি এই প্রফেশনে আসতে চায়, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কি?
প্রফেশন খারাপ না, নতুনরা বেটার কিছু করবে বলেই বিশ্বাস । তবে এখন পর্যন্ত আমি ১০ শতাংশ ছবির টাকাও পাইনি । একজন দুইজন ডিরেক্টর-প্রোডিউসার ছাড়া কেউই টাকা দিতে চায়না।
 
নতুনদেরকে বলবো, শব্দ শোনা শিখুন। শুধু যন্ত্র নয়, চারপাশের জীবনকেও শুনুন। একটা দরজার কড়ার আওয়াজ, একটা নিঃশ্বাস— এগুলোও গল্প বলে। প্রযুক্তি আসবে যাবে, কিন্তু অনুভবটাই সবচেয়ে বড় বিষয়।

নয়াশতাব্দী/এসআর