ইকরামুল হাসান শাকিল। ছবি: নয়া শতাব্দীসপ্তম বাংলাদেশি হিসেবে মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের কীর্তি গড়েছেন ইকরামুল হাসান শাকিল। চলতি বছরের ১৯মে সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে তিনি সর্বোচ্চ শিখরে পদচিহ্ন রাখেন। তবে অন্যদের তুলনায় শাকিলের গৌরবটা বিশ্বে নজিরবিহীন। পদযাত্রা করে সবচেয়ে বেশি পথ পাড়ি দিয়ে সবচেয়ে কম সময়ে ‘সি টু সামিট’ বা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এভারেস্ট জয়ের বিশ্বরেকর্ড গড়ার অধিকারী ৩১ বছরের এই ‘তরুণ তুর্কি’বাংলাদেশির ।
কক্সবাজার ইনানি সমুদ্র সৈকত থেকে পায়ে হেঁটে মোট ৮৪ দিনে এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছান তিনি। এই স্বল্প সময়ে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতের শিখরে পৌঁছানোর অসামান্য কীর্তি নেই পৃথিবীর আর কারো নেই। ১৯৯০ সালে অস্ট্রেলিয়ার পর্বতারোহী টিম ম্যাকার্টনি-স্নেপ ভারতের গঙ্গাসাগর থেকে ৯৬ দিনে ১২শ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গে পদচিহ্ন রাখেন।
তবে ম্যাকাটনির চেয়ে সপ্তাহখানেক কম সময়ে একশ কিলোমিটার বেশি পথ পাড়ি দিয়েছেন গাজীপুরের কালিয়াকৈরের স্বপ্নবাজ এই তরুণ। ম্যাকার্টনি রেকর্ড গড়েছিলেন ৩৪ বছর বয়সে। শাকিল সেই রেকর্ড ভেঙ্গে নিয়ে গড়লেন নতুন ইতিহাস। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত থেকে হেঁটে এভারেস্ট শৃঙ্গ জয় করলেন সর্বকনিষ্ঠ পর্বতারোহী হিসেবে-মাত্র ৩১ বছর বয়সে।
সাড়ে তিন দশক আগে অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক ম্যাকার্টনি যে কৃতিত্ব গড়েছিলেন তাতে বেশ অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন গাজিপুরের কৃষক পরিবারের ছেলে ইকরামুল হাসান শাকিলকে। ম্যাকার্টনির সেই বিরল রেকর্ড ভেঙ্গে নতুন রেকর্ড গড়ার লক্ষ্যে ‘সি টু সামিট’ অভিযান শুরু করেন শাকিল। ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারের ইনানি সি বিচ থেকে শুরু করেন অভিযান। কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত থেকে থেকে যাত্রা শুরু করে শাকিল পাঁয়ে হেঁটে জয় করলেন এভারেস্ট শৃঙ্গ।
২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত থেকে চট্টগ্রাম, ফেনী, কুমিল্লা ও মুন্সিগঞ্জ হয়ে ১২ দিন পর ঢাকায় পৌঁছান। কিছুদিন যাত্রা বিরতি শেষে আবারও হাঁটা শুরু করেন। এসময় গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ হয়ে ২৮ মার্চ পৌঁছান পঞ্চগড়ে পৌঁছান শাকিল। ২৯ মার্চ বাংলাদেশ সীমানা পার হয়ে পা রাখেন ভারতের মাটিতে। পরে জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং হয়ে ৩১ মার্চ প্রবেশ করেন নেপালে। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে ১৩শ ৭২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে অভিযানের ৬৪তম দিনে অর্থাৎ গত ২৯ এপ্রিল নেপালের মাউন্ট এভারেস্টের বেজক্যাম্পে পৌঁছান ইকরামুল হাসান। আর ৮৪তম দিনে পা রাখেন মাউন্ট এভারেস্টের সর্বোচ্চ চূড়ায়।
জাতীয় দৈনিক নয়া শতাব্দীকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে ইকরামুল হাসান শাকিল তাঁর এভারেস্ট জযের গল্প শেয়ার করেন। তিনি বলেন, বেশ প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেই তিনি এভারেস্ট জয় করেন। ২৯ এপ্রিল নেপালের মাউন্ট এভারেস্টের বেজক্যাম্পে পৌঁছানোর পর বেশ কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে মূল অভিযানের জন্য। গত ৬ মে রোটেশনে বের হন শাকিল। একে একে ক্যাম্প–১, ক্যাম্প-২ ও ক্যাম্প-৩ পর্যন্ত পৌঁছান তিনি। সেখান থেকে আবার বেজক্যাম্পে নেমে আসেন ১০ মে। এভারেস্ট অভিযানের মূল শৃঙ্গারোহণের প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে এই পুরো রোটেশন । বেসক্যাম্পে ফিরে ‘সামিট উইনডোর’ জন্য (পর্বতের চূড়ান্ত অবস্থা জানার পর অভিযান শুরু) প্রস্তুতি নিতে থাকেন। এরপর গত ১৬ মে মূল অভিযানের জন্য বেজক্যাম্প থেকে ক্যাম্প–২-এ পৌঁছান ইকরামুল হাসান। ১৭ মে ক্যাম্প-৩ এবং ১৮ মে ক্যাম্প-৪-এ পৌঁছান। পরের দিন ১৯ মে সকাল সাড়ে ৬টার দিকে এভারেস্টচূড়ায় বাংলাদেশের লালসবুজ পতাকা ওড়ান বাংলাদেশি এই তরুণ স্বপ্নবাজ পর্বতারোহী।
পর্বতারোহনের প্রতি আগ্রহের কারণ জানতে চাইলে ইকরামুল হাসান জানান, ছোটবেলা থেকেই দুরন্তপনা স্বভাবের ছিলেন তিনি। খেলাধুলা নিয়েই থাকতেন। ২০১২ সালে এভারেস্ট জয়ী এম এ মুহিত ও নিশাত মজুমদারের একটি সাক্ষাতকার দেখে পর্বত আরোহন যে একটি স্পোর্টস তা তিনি জানতে পারেন। তারপর থেকেই তার মনে এভারেস্ট জয়ের নেশা ঘুরপাক খায়।
এভারেস্ট জয়ের প্রস্তুতি হিসেবে প্রথমে ইকরামুল হাসান ‘বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব’ এর সদস্য হন। পরে ভারতের নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে তিনি পর্বতারোহণের প্রাথমিক ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন। হিমালয়ের ‘কেয়াজো-রি, ‘দ্রৌপদী কা ডান্ডা-২’ ও ‘হিমলুং’, ‘ডোলমা খাং’ পর্বতশৃঙ্গ আরোহণ করেছেন সফলভাবে।
২০২৩ সালে ‘গ্রেট হিমালয়া ট্রেইল’ নামে পরিচিত হিমালয় পর্বতমালার মধ্য দিয়ে ১০৯ দিনে নেপালের পূর্ব থেকে পশ্চিমে চলে যাওয়া ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দুর্গম পথ হেঁটে পাড়ি দিয়ে আলোচনায় আসেন বাংলাদেশের ইকরামুল।
এর আগে, ২০১৯ সালের অক্টোবরে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ইকরামুল হাসান শাকিল নেপালের হিমলুং পর্বতের শিখরে(২৩৩৮০ ফুট উচ্চতায়) সফলভাবে আরোহণ করেন। একই বছর তিনি ‘দ্রৌপদী কা ডান্ডা-২ শৃঙ্গ জয় করেন। এর আগে, ২০১৭ সালে নেপালের মানাসলু হিমালয় অঞ্চলে ২০ হাজার ৫০০ ফুট উঁচু 'লারকে' পবর্তচূড়ায় জয়ের অভিযানে গেলেও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে ওই অভিযান ব্যর্থ হয়।
পর্বতারোহনে আসতে যারা আগ্রহী তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী হতে পারে?-এমন প্রশ্নের জবাবে শাকিল বলেন, ‘পর্বতারোহণেকে বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর সবচাইতে দুঃসাহসিক খেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম। শক্তি, সহ্য ক্ষমতা এবং ত্যাগের চূড়ান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার সক্ষমতা ও প্রবল ইচ্ছাশক্তি , থাকলেই শুধুমাত্র এই অভিযানে অংশগ্রহণ করা যায়। এতে থাকে পদে পদে বিপদ। একটু ভুলের জন্য জীবন চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।’
সমুদ্র থেকে বিশ্বের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো এই অভিযাত্রী আরও বলেন, পর্বতারোহনের আগ্রহী নতুনদের আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তিনি এভারেস্ট জয় করতে চান কিনা? এবিষয়ে ফার্ম ডিটারমাইন্ড হতে হবে। দ্বিতীয়ত: পর্বতারোহণের জন্য প্রশিক্ষণ নেওয়া মাস্ট।
শাকিল বলেন, ‘প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য জন্য ভারতে পাঁচটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। সবগুলোই ভারতীয় সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে থাকে। এর মধ্যে হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট (এইচএমআই), দার্জিলিং, নেহেরু ইনস্টিটিউট অফ মাউন্টেনিয়ারিং (এনআইএম) উত্তরকাশী, এবং অটল বিহারী বাজপেয়ী ইনস্টিটিউট অফ মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড অ্যালাইড স্পোর্টস (এবিভিআইএমএএস) অন্যতম। এই প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন স্তরের পর্বতারোহণের কোর্স পরিচালনা করে এবং এতে আগ্রহী ব্যক্তিরা ভর্তি হতে পারেন।
এছাড়া, এভারেস্ট অভিযানের জন্য প্রথমে দুই হাজার মিটার, চার হাজার মিটার-এাভাবে ধাপে ধাপে উচ্চতায় ওঠার জন্য শরীরকে উপযুক্ত করতে হবে। আর ফিনান্সিয়াল সাপোর্ট থাকলে ভাল হয়। অন্যথায়, স্পন্সর যোগাড় করতে বেশ অসুবিধা মোকাবিলা করতে হয়।
নয়াশতাব্দী/এনএ