উপকুলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরে মেঘনা নদী থেকে গত কয়েক দশক ধরে ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালী ইলিশ ধরা পড়তো। এই নদীর ইলিশ জেলার সাধারণ মানুষের খাদ্য চাহিদা পুরন করে যেত ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন জেলায়, মানুষের খাবারের তালিকায় থাকতো নিয়মিত। কিন্তু বর্তমানে মেঘনা নদীতে ইলিশের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। যার কারনে সেই স্বাদের জনপ্রিয় মাছটি এখন ধীরে ধীরে বিলাসী পণ্যে পরিণত হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে নদীর ইলিশ গেল কই? --আড়ৎদার জেলেরাই বা কি বলছেন?
কথা হয় কমলনগর উপজেলার মতির হাট ও মজু চৌধুরীর হাট মাছ ঘাটের কয়েকজন জেলের সাথে। তারা বলছেন, আগে নদীতে জাল ফেলা হলে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ আসতো । এখন সেই মাছ নেই । কারন হিসেবে তারা জানান ইলিশ মাছ হলো গভীর পানির মাছ। বর্তমানে নদীর বিভিন্ন অংশে চর জাগার কারনে মাছ উজানের দিকে আসতে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।
এদিকে, বাজারে মাছের পরিমান কম থাকায় দামও প্রচুর। এই কারনে মাছ না নিয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে ক্রেতাদের। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলছেন, জ্বলবায়ু পরিবর্তন ও মাঝ নদীতে চর পড়ে যাওয়ায় বঙ্গপোসাগর থেকে নদীর স্রোতে মাছ আসতে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। যার কারনে জেলেরা মাছ পাচ্ছেনা নদীতে।
লক্ষ্মীপুরের মৎস আড়ৎদাররা বলছেন, এক দশক আগেও বর্ষা মৌসুমে প্রতিদিন নদী থেকে বড় বড় ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়া যেত। এখন জাল ফেলে দিনের পর দিন অনেক সময় পার করেও পাওয়া যাচ্ছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। যা পাওয়া যায় তা চাহিদার তুলনায় খুবই নগন্য। ফলে তা বিক্রি করে জেলেদের খরচও পোষায় না। এতে হতাশ আড়ৎদাররা।
কমলনগর উপজেলার বাত্তির খাল এলাকার জেলে জাকির মিয়া বলেন, একটা নৌকা নিয়ে নদীতে গেলে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা খরচ হয়। কিন্তু যে মাছ পাই তা দিয়ে খরচ উঠেনা। সংসার চালানো তো দুরের কথা দাদনের টাকা পরিশোধ নিয়েই চিন্তায় থাকতে হয়। আগে নদীতে অনেক মাছ পেতাম এখন মাছ নেই বললেই চলে। সামনের এই অবস্থা চলতে থাকলে নদীতে আর যাওয়া হবেনা অন্য কাজ করতে হবে। সরকার যদি নদী ড্রেজিং করে তাহলে সাগর থেকে মাছ আসবে। আবার মাছ পাওয়া যাবে।
লক্ষ্মীপুর মজু চৌধুরির হাট মাছ ঘাটের আড়ৎদার ইব্রাহীম বলেন, সকালে ৩ নৌকা থেকে ১২ হাজার টাকার মাছ আসছে। বিকেলে ২ নৌকা মিলে মাছ যেটা পেয়েছে তা দিয়ে তাদের খরচ উঠেনি। মাছ আসেনা তাই আমরাও বেকার বসে আছি। এই ভাবে চলতে থাকলে মাছের দাম আরো বাড়বে।
লক্ষ্মীপুর দক্ষিন তেমুহনীতে মাছ কিনতে আসা আবুল কালাম বলেন, মাছের দাম অনেক বেশি শুনে ইলিশ চোখে দেখেই অন্য মাছ নিয়ে ফিরতে হচ্ছে বাড়িতে, বড় ইলিশ মাছ ২২শ থেকে ৩ হাজার টাকা কেজি মাছের দাম শুনে কিনে নেয়ার সাধ্য নেই আমারদের মত গরীব মধ্য বিত্তদের।
বর্তমানে বড় সাইজের এক কেজি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে দু হাজার তিনশ থেকে শুরু করে ৩ হাজার টাকায়। মাঝারি সাইজের ইলিশের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৫'শ থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত। বিত্তবান লোকজন ছাড়া এখন আর কেউ ইলিশ কিনে খেতে পারেন না। ফলে জাতীয় মাছ ইলিশ এখন পরিনত হয়েছে বিলাসী পন্যে।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্র জানায়, চাহিদার পরিবর্তে মাছের জোগান খুবই কম। ২০২৩ সালে এই জেলায় ইলিশ উৎপাদন হয়েছে ২২৪৪৭ মে:টন ও ২০২৪ সালে উৎপাদন হয়েছে ২০৫৮৯ মে: টন। জেলায় কার্ডধারী জেলের সংখ্যা ৩০৭০১ জন ছাড়াও অনিবন্ধিত জেলেরা এই পুরো এলাকা জুড়ে জেলেরা মৎস আহরন করে থাকে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডার থেকে চাঁদপুর জেলার ষাটনল পর্যন্ত মেঘনা নদীর নিম্ন অববাহিকার ১০০ কিলোমিটার এলাকাকে ইলিশের অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করেছে মৎস্য অধিদপ্তর। এই জেলায় আবার মাছের উৎপাদন বাড়াতে ড্রেজিং করার তাগিদ দেন তিনি। নদী ড্রেজিং এর জন্য মন্ত্রনালয়ে সুপারিশ প্রেরন করা হয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
তিনি জানান, ভারী বর্ষায় অর্থাৎ আগস্ট-সেপ্টেম্বর- অক্টেবর মাসে নদীতে ধরা পড়বে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। সে সময়েই মূল সিজন। তবে জলবায়ুর পরিবর্তন, ডুবোচরের কারনে মাছ ধরা পড়ছেনা।
এদিকে, নিষিদ্ধ সময়ে অবাধে মাছ নিধনকেও দায়ী করে সচেতন মহল। ইলিশ রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে হয়তো শুধু গল্পেই থাকবে সোনালি ইলিশের ঝাঁক। আর সাধারণ মানুষের পাতে সেই স্বাদ হয়ে থাকবে শুধুই স্মৃতি। অর্থনৈতিক দিক থেকেও ইলিশ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মোট ইলিশ উৎপাদনের বড় একটি অংশ আসে মেঘনা নদী এলাকা থেকে। উৎপাদন হ্রাস পেলে জাতীয়ভাবে মাছ রপ্তানি ও অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে।
নয়াশতাব্দী/এসআর